আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ঘিরে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকের ধারণা, দেশটির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র তার বিমান শক্তি ব্যবহার করে চূড়ান্ত আঘাত হানতে পারে। তবে সামরিক বিশ্লেষক ও কৌশলবিদদের মতে, ইরানের ওপর কোনো ‘দ্রুত ও পরিষ্কার’ মার্কিন আক্রমণ বাস্তবে যতটা সহজ মনে হয়, ততটাই জটিল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনিশ্চিত।

ইরানের শাসনব্যবস্থা কোনো একক ব্যক্তিনির্ভর পিরামিড নয়। বরং এটি একটি জটিল ও নেটওয়ার্কভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামো, যেখানে সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), গোয়েন্দা সংস্থা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা একে অপরের সঙ্গে ওভারল্যাপ করে কাজ করে। ফলে শীর্ষ নেতৃত্বের কাউকে সরিয়ে দিলেও পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম। এই কাঠামোর মধ্যে বিকল্প কমান্ড ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে, যা বড় ধরনের আঘাতও সামাল দিতে সক্ষম।


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও বহুমুখী রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কট্টরপন্থিরা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইরানে শাসন পরিবর্তনের দাবি তুলছে, অন্যদিকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সমর্থকেরা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল কোনো যুদ্ধের ঘোর বিরোধী। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় পরিসরের সামরিক অভিযান শুরু করা কৌশলগত ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন।
আঞ্চলিক সমীকরণও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনুকূল নয়। ইসরায়েল তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে থাকলেও উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার ও ওমান উত্তেজনা প্রশমন ও কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। এসব দেশের সমর্থন এবং ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দূর থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর বিমান অভিযান চালানো প্রায় অসম্ভব।
নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে তথাকথিত ‘শিরশ্ছেদ’ হামলা অনেক সময় সিনেমার দৃশ্যের মতো আকর্ষণীয় মনে হলেও, ইরানের মতো নেটওয়ার্কভিত্তিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর নয়। সামরিক শক্তি দিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস করা সম্ভব হলেও, তা কোনো টেকসই রাজনৈতিক পরিবর্তন বা ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে পারে না। বরং এমন হামলা ইরানের কট্টরপন্থি শক্তিগুলোকে আরও ঐক্যবদ্ধ করে তুলতে পারে।
২০১১ সালের লিবিয়া অভিযান এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক উদাহরণ। বিমান শক্তি দিয়ে বিক্ষোভকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় না, কিংবা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কাঠামোও গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ইরানের ক্ষেত্রে সামরিক হামলা বড়জোর তেহরানকে আলোচনার টেবিলে বসাতে বাধ্য করার একটি উচ্চঝুঁকির কৌশল হতে পারে, যা অনেক সময় উল্টো ফল বয়ে আনে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাহ্যিক সামরিক চাপ খুব কম ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটনের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফলাফল এনে দেয়। প্রকৃত ও টেকসই পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয় তখনই, যখন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে বিভাজন দেখা দেয় বা ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। জোরপূর্বক ব্যবস্থা আরও কঠোর করার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখা এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তববাদী রাজনৈতিক রূপান্তরের সুযোগ তৈরি করা।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র হয়তো এই দফার বিক্ষোভ দমন করতে সক্ষম হবে, তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অর্থনৈতিক সংস্কার ছাড়া সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করা কঠিন। দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে শাসকগোষ্ঠীকে ধর্মতান্ত্রিক গোঁড়ামি পরিহার করে আরও বাস্তববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে হবে।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available