• ঢাকা
  • |
  • মঙ্গলবার ২০শে মাঘ ১৪৩২ রাত ০৩:২৩:২৭ (03-Feb-2026)
  • - ৩৩° সে:
কুয়াকাটা ২০ শয্যা হাসপাতালে সেবা থেকে বঞ্চিত দুই লাখ মানুষ ও পর্যটকরা

কুয়াকাটা ২০ শয্যা হাসপাতালে সেবা থেকে বঞ্চিত দুই লাখ মানুষ ও পর্যটকরা

পটুয়াখালী প্রতিনিধি: কুয়াকাটা ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে চলছে চিকিৎসার সেবার নামে জনবল সংকটের নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা। এর ফলে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পৌরসভাসহ মহিপুর থানার অন্তর্গত তিনটি ইউনিয়নের প্রায় দুই লাখ মানুষ কার্যত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা লাখো পর্যটকের জরুরি চিকিৎসা সেবাও পড়েছে চরম হুমকির মুখে।জানা যায়, কুয়াকাটাকে পর্যটন এলাকা ঘোষণা করার পর স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০১২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করে কুয়াকাটা ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল। তবে শুরুর পর থেকেই জনবল, ঔষধ ও যন্ত্রপাতি সংকটের অজুহাত দেখিয়ে রোগীদের প্রকৃত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ।হাসপাতালটিতে নেই কোনো ধরনের ভ্যাকসিন, সাপের কামড়ে ব্যবহৃত এন্টিভেনম কিংবা পোড়া রোগীর জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা। ফলে দুর্ঘটনায় আহত পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা, শিশু রোগী, প্রসূতি মা ও নবজাতক, এমনকি বৃদ্ধ নারী-পুরুষও হাসপাতাল থাকতেও বাধ্য হচ্ছেন অন্যত্র ছুটতে।হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এখানে কর্মরত জনবল মাত্র ৯ জন। এর মধ্যে রয়েছেন ১ জন আরএমও, ৫ জন নার্স, ১ জন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, ১ জন ওয়ার্ড বয় এবং ১ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট। এছাড়া কোনো চুক্তিভিত্তিক বা আউটসোর্সিং কর্মী নেই। এত অল্প জনবল দিয়ে একটি ২০ শয্যার হাসপাতাল কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যে অসম্ভব, তা বলছেন সংশ্লিষ্টরাও।হাসপাতালে এক ধরনের ব্লাড টেস্ট ও এক ধরনের ইউরিন টেস্ট ছাড়া আর কোনো কার্যকর পরীক্ষা ব্যবস্থা নেই। বেশ কিছু যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালের একাংশ অসাধু কর্মচারী ও বহিরাগত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদেরকে পরিকল্পিতভাবে বাহিরের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে।সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, দ্বিতল ভবনের হাসপাতালটিতে কেবল নিচতলায় কয়েকটি কক্ষে জরুরি বিভাগ, আউটডোর, প্যাথলজি বিভাগ ও ডাক্তারের কক্ষ খোলা। নিচতলায় একটি বড় বিশ্রাম কক্ষ এবং দোতলায় একাধিক বেডরুম থাকলেও সেগুলো স্বাস্থ্যসেবার কাজে ব্যবহার হচ্ছে না।আরএমওকে উপস্থিত পাওয়া না গেলেও একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার একাই রোগীদের টেস্ট ও চিকিৎসাপত্র দিচ্ছিলেন। এ সময় চেম্বারের বাইরে অবস্থান করতে দেখা যায় একজন বহিরাগত দালালকে, যিনি রোগীদেরকে পরীক্ষা করানোর জন্য বাহিরের ডায়াগনস্টিকে পাঠাচ্ছিলেন।হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০ জন রোগী আউটডোরে টিকিট কেটে চিকিৎসা নেন। সে হিসাবে মাসে প্রায় তিন থেকে চার হাজার রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসছেন। অথচ গত নভেম্বর মাসে হাসপাতালে মাত্র ৭৬টি, ডিসেম্বর মাসে ৫৫টি এবং চলতি জানুয়ারির ২০ তারিখ পর্যন্ত মাত্র ১৮টি পরীক্ষা করা হয়েছে।চিকিৎসা নিতে আসা গুরুতর রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার করার নিয়ম থাকলেও চলতি মাসে মাত্র ৩ জন রোগীকে রেফার করা হয়েছে। বাকিদের অধিকাংশকেই দালালচক্রের মাধ্যমে বাহিরের ডায়াগনস্টিকে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ।চিকিৎসা নিতে আসা রিয়াজ বলেন, আমার হাত ভেঙে গিয়েছিল। এখানে পাঁচবার এক্সরে করাইছি, প্রতিবার রিপোর্ট ভুল আসে। হাতের চিকিৎসায় প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পরে শহরে নিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে ভালো হয়েছি।ফরিদা বেগম বলেন, যখনই আসি তখনই ডাক্তার পাই না। বাধ্য হয়ে কলাপাড়া গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়।স্থানীয় বাসিন্দা জয়নব বলেন, দশ দিন টাকা জমাইয়া ডাক্তার দেখাইতে আসছি। কিন্তু যেই ডাক্তার দেখাইতে আসছি সে নাই। এখানে ভর্তি ব্যবস্থা থাকলে আমাদের অনেক উপকার হতো।রোগীর স্বজন আবু বক্কর বলেন, এখানে আসলে কোনোদিন হাসপাতালে টেস্ট করাইতে পারি নাই। প্রায় সময় টেস্ট করানোর লোক থাকে না। ঔষধও অল্প কিছু দেয়, বাকিগুলো বাহির থেকে কিনতে হয়।নারী রোগীর স্বামী মহিবুল্লাহ বলেন, আমার স্ত্রীর মাসিকের সমস্যা নিয়ে আসছি। টেস্ট বাহিরে করাইছি। আমরা তো সাধারণ মানুষ, কে ডাক্তার আর কে কম্পাউন্ডার তা বুঝি না।ওয়ার্ড বয় মো. জালাল বলেন, গড়ে ৫০ জনের মতো রোগী টিকিট কাটে। কলাপাড়া থেকে কিছু ঔষধ দেয়, সেগুলো দিয়ে কোনোমতে চলি। পরে ওষুধ শেষ হয়ে যায়।সিনিয়র স্টাফ নার্স মাকসুদা বলেন, এখানে কোনো ভ্যাকসিন নেই। পোড়া রোগী এলে বাহির থেকে জিনিস কিনে এনে চিকিৎসা দিতে হয়। সিরিয়াস রোগী হলে উপজেলায় রেফার করি।উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার সোহেল রানা বলেন, আরএমও স্যার পাঁচ দিনের ছুটিতে আছেন। বর্তমানে দায়িত্বে আমি আছি। ছোটখাটো দুই একটি টেস্ট এখানে করা যায়, বাকিগুলো বাহিরে পাঠাতে হয়।পটুয়াখালী সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটায় ২০ শয্যা হাসপাতাল রয়েছে। কলাপাড়া থেকে ঔষধ সরবরাহ করা হয়। ওখানে আলাদা কোনো ডিডিওসিট নেই কুয়াকাটা হাসপাতালে বাজেটের জন্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ঔষধ সরবরাহ করা জন্য ওখানে চলমান নিজস্ব একটি ব্যবস্থা হবে। পটুয়াখালীতে ডাক্তার সংকটে রয়েছে এক তারিখ নতুন ডাক্তার জয়েন করবে। ইনশাআল্লাহ চাহিদা পূরণ হয়ে যাবে। এছাড়া অন্য কোনো যদি অনিয়ম থাকে সে ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।পর্যটন এলাকা হওয়া সত্ত্বেও কুয়াকাটার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একটি ২০ শয্যা হাসপাতাল কেন কার্যত অকার্যকর তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। তারা দ্রুত জনবল নিয়োগ, সব শয্যা চালু, জরুরি ও পরীক্ষা সেবা নিশ্চিত এবং হাসপাতালের ভেতরে গড়ে ওঠা দালালচক্র ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।