নিজস্ব প্রতিবেদক: রংপুরে আলুর দামে যখন ধস নেমেছে ঠিক তখন অকাল বৃষ্টিতে কপাল পুড়ল চাষিদের। হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া ও ভারি বৃষ্টিপাতে আলু ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় নতুন করে তৈরি হয়েছে আলুতে পচন ধরার তীব্র আশঙ্কা। আলুর দরপতনের হাহাকারের মাঝেই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।
১২ মার্চ বৃহস্পতিবার দিবাগত ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত হওয়া এই বৃষ্টিতে রংপুর নগরীর মাহিগঞ্জ, আমাশু কুকরুল, সদরের পালিচড়া ও পীরগাছা উপজেলাসহ বিভিন্ন স্থানে এ ক্ষতির চিত্র দেখা যায়।


সরেজমিনে দেখা যায়, পীরগাছা উপজেলার তাম্বুলপুর, ছাওলা, অন্নদানগর ও কান্দি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ আলুক্ষেত পানিতে তলিয়ে আছে। ফসল বাঁচাতে ক্ষেত থেকে পানি সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন কৃষকরা।

উপজেলার ছাওলা ইউনিয়নের কৃষক ইসমাইল হোসেন বলেন, ১০ বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করছি, ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে ঝড়-বৃষ্টিতে আলুর অনেক ক্ষতি হইল। সকালে এসে দেখি আলুক্ষেতে অনেক পানি জমে গেছে। এখন পানি কমানোর চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, বাজারে আলুর দাম নাই, কেজি মাত্র ৮ থেকে ১০ টাকা। এখন বৃষ্টির কারণে কেজিপ্রতি আরও দুই টাকা কমে যাবে। এ অবস্থায় মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে গেল এই বৃষ্টি।
আলুচাষি এমদাদুল হক বাবু বলেন, সারের সংকট ও দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ধারদেনা করে আলু চাষ করে এখন বিপাকে আছি। বাজারে দাম নেই। কোল্ডস্টোরে রাখতে হলে বাড়তি টাকা গুণতে হচ্ছে। না হয় কালোবাজারি ও সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কাছে অল্প দামে আলু বিক্রি করতে হবে। এ কারণে ক্ষেতের মধ্যেই আলু রেখেছিলাম। দাম ভালো মিললে বিক্রি করব কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে গেল।
তিনি বলেন, শুধু তার নয়, গ্রামাঞ্চলের বেশির ভাগ আলুচাষি এই অকাল বৃষ্টিতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একদিনে বাজারে আলুর দাম নেই অন্যদিকে এমন ঝড়-বৃষ্টিতে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
নগরীর আমাশু কুকরুল এলাকার কয়েকজন কৃষক জানান, গত কয়েক বছর আলু চাষ করে তাদের অনেকেই লোকসানের মুখে পড়েছেন। এবার ফলন ভালো হলেও বৃষ্টিতে হতাশ তারা।
কৃষক মোহাম্মদ আরিফ জানান, তার মোট জমিতে ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু একদিকে বাজারে আলুর দাম কম, অন্যদিকে সিন্ডিকেট। এর সাথে যোগ হয়েছে বৃষ্টি। এ পরিস্থিতিতে গত বছরের মতো এবারও আলুতে লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি।
আরেক কৃষক জানান, গত বছর তিনি কোল্ড স্টোরেজে লাভের আশায় কিছু আলু রেখেছেন। কিন্তু দাম কম থাকায় কোল্ড স্টোর থেকে সেই আলু আর আনেননি। এমন হতাশা রংপুরের বহু আলু চাষির। কৃষকদের এই দুর্দিনে ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে সরকারসহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সুনজর প্রত্যাশা করছেন তারা।
এদিকে, কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের আট জেলায় এবার প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। মোট উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫৬ লাখ ৬৮ হাজার ৯৯২ টন। এর মধ্যে রংপুর জেলায় আলুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৪ হাজার ৫০ হেক্টর। গত বছর ছিল ৬৬ হাজার ২৮০ হেক্টর। যা গত বছরের তুলনায় উৎপাদন কমেছে ১৩ হাজার হেক্টর।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বিভাগের ১১৬টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৯ হাজার ৬৯২ টন আলু। বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণ সংকট ও বাজারদরের পতনের কারণে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। শুধু হিমাগারে সংরক্ষিত আলুতেই এবার প্রায় ১ হাজার ৯৯৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকার লোকসান হয়েছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিভাগে রেকর্ড পরিমাণ জমিতে আলুর আবাদ করা হয়েছে। হঠাৎ বৃষ্টিতে আলুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং পচে নষ্ট হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ক্ষেত থেকে পানি সরিয়ে যেকোনোভাবে আলু রক্ষার জন্য চাষিদের আমরা পরামর্শ দিচ্ছি।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ভোর ৪টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ৪ থেকে ৫ দিন থেমে থেমে এমন বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ ক্ষেত মজুর ও কৃষক সংগঠনের রংপুর জেলা আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন বাবলু বলেন, আলুর বাজারদর কেজিপ্রতি ৩-৪ টাকাতে নেমেছে এবং দেশজুড়ে বোরো আবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সারের সংকট ও দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। আলু আমাদের প্রধান সবজি এবং অর্থকরী ফসল। বিশ্বব্যাপী আলুর চাহিদা ব্যাপক। অথচ দেশের বাজারে আলু চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এমন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আলু নিয়ে চাষিরা আরো বেশি চিন্তিত। সরকারের উচিত হবে আলুর লাভজনক দাম নিশ্চিত করাসহ দুর্নীতি ও কালোবাজারি বন্ধ করে ভর্তুকি মূল্যে প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকের সার পাওয়ার নিশ্চয়তা করা।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available