• ঢাকা
  • |
  • শুক্রবার ২৪শে মাঘ ১৪৩২ রাত ১০:১০:১৯ (06-Feb-2026)
  • - ৩৩° সে:

স্ট্রোকে অবহেলা করলেই বিপদ!

২৯ অক্টোবর ২০২৫ দুপুর ১২:১৯:২৬

স্ট্রোকে অবহেলা করলেই বিপদ!

নিজস্ব প্রতিবেদক: “প্রতিবছর ২৯ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী ‘স্ট্রোক ডে’ পালিত হয়। মূলত স্ট্রোক কী, এটি কেন হয় এবং এর প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায় কী—এই বিষয়গুলোতে আলোকপাত করার উদ্দেশ্যে এই দিনটি পালিত হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও বর্তমানে এটি পালিত হয়। এর ফলে স্ট্রোক প্রসঙ্গে সচেতনতাও ইতিবাচকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।”

Ad

স্ট্রোক কী?

Ad
Ad

স্ট্রোক মূলত মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত একটি ব্যাধি, যা মানবশরীরের জন্য ক্ষতিকর ও দুর্দশাময় পরিণতি বয়ে আনতে পারে। পক্ষাঘাতের কারণে স্ট্রোকে আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়। আমরা যদি আমাদের একটি হাত, একটি পা ও মুখমণ্ডলের একটি অংশের কোনো প্রকার ব্যবহার না করে একটি দিন পার করার কথা কল্পনা করি, তাহলে আমরা কিছুটা আন্দাজ করতে পারব যে স্ট্রোক একজন মানুষকে কতটা কাবু করে ফেলতে সক্ষম।

ব্রেন স্ট্রোকের কারণে মূলত মস্তিষ্কের রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

আমাদের মস্তিষ্ক অসংখ্য ক্ষুদ্র ও অতিমাত্রায় সংবেদনশীল কোষ দিয়ে গঠিত হয়। এই কোষগুলোর সঠিক কার্যকারিতার জন্য প্রয়োজন সার্বক্ষণিক রক্তসঞ্চালন। অক্সিজেন কিংবা শর্করার ন্যূনতম ঘাটতি দেখা দিলেও মস্তিষ্কের কোষগুলো নষ্ট হতে শুরু করে। দুর্ঘটনাজনিত কারণ বাদে অন্য কোনো অবস্থায় যদি মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্তসঞ্চালন ব্যাহত হয় এবং তা ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকে কিংবা এর মাঝেই রোগী মারা যায়, তাহলে এটি ব্রেন স্ট্রোক বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে।

স্ট্রোকের অন্যতম লক্ষণ হলো- প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, স্ট্রোক-পরবর্তীকালে ব্যক্তির শরীরের যেকোনো একটি পার্শ্ব অবশ বা অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছে। স্ট্রোকের ধরন ও মাত্রার ওপর এর পরিণতি নির্ভর করে। কিছু ক্ষেত্রে স্ট্রোকের কারণে মৃত্যুও হতে পারে।

মস্তিষ্কের যে অংশ স্ট্রোকের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, সে অংশের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঙ্গগুলো স্ট্রোক-পরবর্তীকালে অসাড় হয়ে পড়ে। সুতরাং ব্যক্তির মস্তিষ্কের ডান পাশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীরের বাঁ অংশ এবং বাঁ পাশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ডান অংশ কার্যকারিতা হারায়। আমাদের অনেকেরই একটি ভুল ধারণা রয়েছে, স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক দুটি একই রোগ। বস্তুত স্ট্রোক কোনো হৃদরোগ নয়, অর্থাৎ হৃদপিণ্ডের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

স্ট্রোকের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে দুর্বলতা, শরীরের এক পাশের অসাড়তা, মাথা ব্যথা, বমি, কথা বলার ক্ষেত্রে দুর্বলতা, হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়াসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা।

এর ফলে চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসতে পারে, ঘাড়, মুখমণ্ডল ও দুই চোখের মধ্যবর্তী স্থানে ব্যথা হতে পারে। শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে অসুবিধা দেখা দিতে পারে, মুখের কথাও জড়িয়ে আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে ‘এফএএসটি’ (ফাস্ট) শব্দটিকে সূত্র হিসেবে মনে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে, যেখানে এফ—ফেশিয়াল ডিফরমেশন বা মুখমণ্ডলের বিকৃতি; এ—আর্ম উইকনেস বা হাত বা বাহুর অসাড়তা; এস—স্পিচ ইম্পেডিমেন্ট বা কথা বলার ক্ষেত্রে দুর্বলতা এবং টি—টাইম টু কল ইমার্জেন্সি অর্থাৎ জরুরি চিকিৎসা গ্রহণের ব্যবস্থা নির্দেশ করে। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, স্ট্রোকের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সময় ও দ্রুততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। কত দ্রুত একজন রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনা হয়েছে, তার ওপর রোগীর বাঁচা-মরা অনেকাংশেই নির্ভর করে। তাই লক্ষণ গুলো দেখা দিলে উদ্বিগ্ন না হয়ে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

মস্তিষ্কে প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে স্ট্রোককে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। একটি হলো ইসকেমিক স্ট্রোক এবং অন্যটি হেমোরেজিক স্ট্রোক। মস্তিষ্কের রক্তনালির ভেতরে রক্ত জমাট বাঁধা কিংবা জমাট বাঁধা রক্ত মস্তিষ্কে প্রবাহিত হওয়ার কারণে একজন মানুষ ইসকেমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হতে পারে। ইসকেমিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার তুলনামূলক কম হলেও এটি মানবশরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে সক্ষম। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা স্থায়ীভাবে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

হেমোরেজিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে রক্তনালি ফেটে মস্তিষ্কের ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে। হাসপাতালে আনার সময় বেশির ভাগ রোগীই অচেতন অবস্থায় থাকে কিংবা উচ্চ রক্তচাপে দুর্বল হয়ে পড়ে। হেমোরেজিক স্ট্রোকে মৃত্যুর হার অধিক হয়ে থাকে। তবে প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারা রোগীদের মাঝে দ্বিতীয়বার এমন স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কম হয়। স্থায়ীভাবে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও কম থাকে।

স্ট্রোকের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে একজন রোগীকে কতটা দ্রুততা ও পরিচর্যার সঙ্গে সঠিক চিকিৎসার আওতায় আনা হচ্ছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি একজন স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে আনা সম্ভব হয়, সে ক্ষেত্রে থ্রম্বোলাইসিস ও থ্রম্বেকটমির মাধ্যমে তার চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব। থ্রম্বোলাইসিস বলতে ইঞ্জেকশনের সাহায্যে জমাট বাঁধা রক্ত গলিয়ে ফেলা এবং থ্রম্বেকটমি বলতে স্টেন্টের মাধ্যমে জমাট বাঁধা রক্ত বের করে আনার প্রক্রিয়াকে বোঝায়।

সাধারণত ৫৫ বছরের ঊর্ধ্বের যেকোনো ব্যক্তিই স্ট্রোকের ঝুঁকিতে থাকেন। নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও স্থূলতা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। পরিবারে এরই মধ্যে কারো স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকলে অন্য সদস্যদের মধ্যেও এর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি বলে ধরে নেওয়া যায়। এ ছাড়া ধূমপান বা মদ্যপান, হার্ট ফেইলিওর, হার্ট ইনফেকশন, হরমোন থেরাপি ও জন্ম নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ প্রভৃতি গ্রহণ করে থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি থাকে।

কোনো রোগীর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে বা শ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে তাকে দ্রুত কৃত্রিমভাবে শ্বাস প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস দেওয়া যেতে পারে। রোগীর বমি হয়ে থাকলে সে ক্ষেত্রে তার মাথা এক পাশে কাত করে রাখতে হবে। রোগীর পরিচর্যকারীদের মনে রাখতে হবে, এ সময় রোগীকে কোনো প্রকার কঠিন বা তরল খাবার দেওয়া যাবে না। অজ্ঞান রোগীদের ক্ষেত্রে শ্বাসপ্রক্রিয়া, শ্বাসনালি ও রক্ত সঞ্চালনসহ ব্যক্তির শরীরের সার্বিক প্রক্রিয়া যত দ্রুত সম্ভব মনিটরিং শুরু করতে হবে। তাকে এক পাশে কাত করে শুইয়ে দিতে হবে, প্রয়োজনে মূত্রত্যাগের জন্য ক্যাথেটারের সাহায্য নিতে হবে। রোগীর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যার জন্য সর্বদা কাউকে না কাউকে তার পাশে থাকা উচিত। কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও তথ্যের আদান-প্রদানের মাধ্যমে রোগীর শারীরিক অবস্থা ও করণীয় প্রসঙ্গে সচেতন থাকা সব পরিচর্যাকারীর কর্তব্য।

স্ট্রোক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিকার যোগ্য। তাই বলে এর ঝুঁকিকে অবহেলা করার কোনো অবকাশ নেই। প্রত্যেক সুস্থ ব্যক্তিরই উচিত স্ট্রোকের কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা এবং বিধি-নিষেধ অনুসরণ করে চলা। একটি নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের জন্য প্রত্যেকেরই উচিত নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়াম করা। সেই সঙ্গে খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করা, কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। এ ছাড়া নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা, ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা, ওজন মাপা ইত্যাদি বিষয়ে সতর্ক থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে পুষ্টিবিদরা সবাইকে সুস্থ অবস্থায় শাক-সবজি, ছোট মাছ, সামুদ্রিক মাছ, ডিম, দুধ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

লেখক:
ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল।
চেম্বার: পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লি, ২,শ্যামলী, মোহাম্মদপুর ঢাকা। হটলাইন: ০১৮৮৬-১৮০-৬৫৯
০১৯২৭-০৭৮-৭৬৬

Recent comments

Latest Comments section by users

No comment available

সর্বশেষ সংবাদ



শৈলকুপায় বিশ্ব মেছোবিড়াল দিবস পালিত
শৈলকুপায় বিশ্ব মেছোবিড়াল দিবস পালিত
৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাত ০৯:০৯:৪১



নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন, ৫ জামায়াত নেতাকর্মী আটক
নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন, ৫ জামায়াত নেতাকর্মী আটক
৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সন্ধ্যা ০৭:৪৬:৪৭



বিএনপির ইশতেহারে যা আছে
বিএনপির ইশতেহারে যা আছে
৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সন্ধ্যা ০৭:২৭:৫১



Follow Us